1. banglamailnews72@gmail.com : banglamailnews : Zakir Khan
রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৯ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
২০০৫ সালের ৫ আগষ্ট – – – – – জাকির খান চার দশকেরও অধিক ইমামতির জীবনের আনুষ্ঠানিক বিদায়-এক আবেগঘন স্মরণীয় দিন! ফেইসবুক ম্যাসেঞ্জারে লাইভ কবিতার আড্ডা হবে ————————————– এক মুঠো কদমের গল্প _ _ _ এঞ্জেল নীপা _ ______________ আমার আব্বা মোঃ আলমগীর খান – না ফেরার দেশে চলে গিয়েছিল – – –৩টি বছর অতিক্রম করলো আল্লাহ্‌,আল্লাহ্‌,আল্লাহ্‌ – – – জাকির খান মিরপুর ২ এ জাতীয় গৃহায়নের নিষ্কন্টক ৭৬ কাঠা জমিতে, শেয়ারে নির্মিত হতে যাচ্ছে সুপার কন্ডোমিনিয়াম ” দা ফ্যালকন হাইটস” নীলকলম সাহিত্য সংগঠনের পক্ষ থেকে ,নীলকলম সভাপতি বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক মাহবুবা চৌধুরীর নেতৃত্বে আমরা আজ এক ঝাঁক সাহিত্য প্রেমী গিয়েছিলাম মানবিক কাজে ,বেওয়ারিশ মানবসেবা বৃদ্ধাশ্রমে – – – – শিরিন আফরোজ মাত্র ৮,০০০ টাকা মাসিক কিস্তিতে শুরু হোক আপনার স্বপ্নের বাড়ির যাত্রা কৃষিবিদ সিটিতে ———– শিক্ষা কোনো দল, মত বা আদর্শের বিষয় নয়; বরং এটি একটি সার্বজনীন সামাজিক দায়িত্ব – – – লামিয়া ইসলাম

#ছোটগল্প # শূন্যতায়_বসবাস ### নুসরাত জাহান লিজা

  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২১
  • ৫৩৩ বার

প্রকাণ্ড জমিদার বাড়িটা সময়ের আবর্তে মলিন হলেও এখনো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সদর্পে। বাড়ির চারপাশ পুরনো আমলের ইটের দেয়ালে ঘেরা। তারই বিশাল বারান্দায় আসন পেতে বসে এই বাড়ির সর্বময় কর্ত্রী জাহানারা বেগম বেশ আয়েশ করে পান মুখে দিয়ে চিবুতে লাগলেন। জমিদার বাড়ির চাকচিক্য যদিও এখন আগের মতো নেই, ধূলো জমে কিছুটা ম্লান কিংবা কোথাও ভেঙ্গেচুরে প্রায় নাজুক। তবুও যেটুকু অবশিষ্ট আছে সেটুকু ওই জাহানারা বেগমের জন্যই। বাড়িতে যে কয়জন সদস্যের বসতি, সবাই তটস্থ থাকে সারাক্ষণ। অথচ তিনি যখন এই বাড়িতে প্রথমবার পা রেখেছিলেন, সেই কৈশোরে, কী এক ভয়ে সারাক্ষণ কেমন সিটিয়ে থাকতেন! এতবড় বাড়ি, একান্নবর্তী পরিবার আর কত বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য দাদী-শাশুড়ি, শাশুড়ি, শ্বশুর! সংসারধর্ম সম্পর্কিত সবকিছুতেই ছিলেন একেবারেই আনাড়ি! তবে তাঁর ভাগ্য অত্যন্ত সুপ্রসন্ন ছিল বলেই না এতো ভালো শাশুড়ি পেয়েছিলেন, যিনি হাতে ধরে গড়ে নিয়েছিলেন! যেভাবে একতাল মাটিকে কুমোর অত্যন্ত নিপুন হাতে কী সুন্দর ছাঁচে ফেলে নিখুঁত অবয়ব দেয়! আর সার্বক্ষনিক তত্বাবধানের জন্য এহসান তো ছিলই। এত ভালো স্বামী ভাগ্য পেয়েছিলেন বলে সেসময় একটা অদ্ভুত সুখ সুখ ঘোর তাঁকে সবসময় ঘিরে রাখত! এত ভালো বলেই হয়ত চলে গেলেন বড্ড দ্রুত, বড্ড অকালেই!
প্রতি পূর্নিমায় যখন দিগন্ত বিস্তৃত জ্যোৎস্নার আলোয় পৃথিবী ভেসে যেত, সেই জ্যোৎস্নার জলে অবগাহনের জন্য এহসানের প্রস্তুতির শেষ থাকত না! বাড়ির লোকের চোখ ফাঁকি দিয়ে নৌকায় করে ভেসে বেড়াতেন দুজন। জাহানারা অবশ্য ভয় পেতেন খুব, বাড়িতে জানাজানি হলে কেলেঙ্কারির একশেষ! কিন্তু এহসান সেসব কথা কানেই তুলতেন না। অদ্ভুত ক্ষ্যাপাটে আর খেয়ালী স্বভাবের ছিলেন কিনা, নিজের খেয়ালে চলতেন! নিজেই নৌকা বাইতে বাইতে বলতেন,
“আরে ধূর, তুমি শুধু শুধুই ভয় পাও, জানলে জানলই নাহয়, তাতে কী এমন হবে? আমরা কি চুরি করতে বেরিয়েছি নাকি? এই যে এত সুন্দর চাঁদ উঠেছে, কী অদ্ভুদ সুন্দর আলো! এই আলোতে না ভিজলে চাঁদের মন খারাপ হবে না বুঝি!”
এমনই পাগলাটে ছিল লোকটা! এই কথা বলেই হেসে উঠতেন সশব্দে। সেই হাসি ছন্দ তুলত জাহানারার কানে, সহস্র তারের ঝঙ্কার তুলত সে হাসি! কী ভীষণ সুন্দর করে যে হাসতো মানুষটা! হাসিতে কি আসলেই এত সুর আর ছন্দ থাকে? নাকি বিশেষ মানুষের হাসিই এমন সুরেলা আর ছন্দময় হয়? সে হাসিতেই চেয়ে চেয়ে সহস্র বছর কাটিয়ে দিতে পারতেন জাহানারা!
পাটাতনে বসে সেই অদ্ভুত সুন্দর পৃথিবী ভাসানো জ্যোৎস্না উপভোগ করতেন, সাথে সেই উদ্ভাসিত হাসিমুখ দেখতেন আচ্ছন্ন চোখে! চাঁদের আলো পানিতে কেমন চিকচিক করত, বাকিটা ধূধূ প্রান্তর! বহুদুরের গাছের সারিকে কেমন অদ্ভুত লাগত! মনে হত এই পুরো বিশ্বচরাচরে তাঁরাই একমাত্র বাসিন্দা! সবটা মিলিয়ে এক ঘোরলাগা স্বপ্নময় পরিবেশ! কেমন অতিপ্রাকৃত, আপার্থিব!
এতদিন পরে সেই অদ্ভুত সুন্দর স্মৃতিগুলোই তো জাহানারার একমাত্র সম্বল! লোকটা কি বুঝতে পেরেছিলেন এত দ্রুত চলে যাবেন? তাই কি এত সুন্দর কিছু সময় ওকে দিয়েছিলেন বাকি জীবন বাঁচবার রসদ হিসেবে?
একবার তো কেলেঙ্কারিটা হয়েই গিয়েছিল, জাহানারা বেগম তখন সবে নিজের মধ্যে নতুন অস্তিত্বের আবিষ্কার করেছেন। পুরো বাড়িতে খুশির বন্যা! এহসান তো সেই স্বপ্নেই বিভোর! জাহানারাই বা কম কীসে! তখন আর কতটুকুই বা বয়স, পনেরো পেরিয়ে ষোলোতে পরার অপেক্ষায়! এরমধ্যে একদিন এহসান গোঁ ধরে বসলেন, সেদিনও যাবেন চন্দ্রবিলাসে! চারমাসের অন্তঃসত্ত্বা তখন জাহানারা। প্রথমে সম্মতি না দিলেও পরে রাজি হয়ে যান মানুষটার তীব্র উৎসাহে।
ভোরের আগে আগে বাড়িতে ফিরতেই দাদীর সামনে পরে যান,
“তোগোর আক্কেলবুদ্ধি কিচ্ছু নাই মাথার মইধ্যে? তুমি পোয়াতি মাইয়া হইয়্যা কেমনে ঢ্যাংঢ্যাং কইরা মাঝনদীত গেলা? আর এহসান, ওর নাহয় বয়স কম, তুই তো বুঝস। এইসব পাগলামির কোনো মানে হয়? ভালো-মন্দ কিছু হইলে?”
আরও কতরকম যে কথা শুনালেন, এহসান সেসব হেসে উড়িয়ে দিলেও জাহানারা বাকি রাতটা গুম মেরে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকলেন খাটে হেলান দিয়ে। এই বাড়িতে আসার পর থেকে সবার স্নেহ ভালোবাসাই পেয়ে এসেছেন, শাসন পাননি বলেই হয়ত অভিমান হয়েছে খুব। পরেরদিন সকাল হতেই দাদীর ডাকে তাঁর কাছে গিয়ে বসতেই মাথায় বুলিয়ে দিলেন স্নেহের পরশ, আর কিছু উপদেশবানী। আর তাতেই অভিমান গলে জল!
এহসান তো ফোঁড়ন কেটে স্বভাব সুলভ হাসিমুখে বলেই ফেললেন,
“একটু আগেই তো চেহারায় মেঘের ঘনঘটা ছিল, এখনি আবার উজ্জ্বল রোদ্দুর!”
এতদিন পরেও স্মৃতির ঝাপসা আয়নায় যখন দৃষ্টি ফেলেন, সেসব ফেলে আসা স্মৃতি কী সুন্দর জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠে হৃদয়পটে! এতটুকু ধূলো পড়েনি, মলিন হয়নি, শ্বাশ্বত অম্লান যেন!
এভাবেই সময় গড়াচ্ছিল, প্রথম ছেলের জন্মের পর যখন দ্বিতীয় দফায় মা হবার স্বপ্নে বিভোর, তখনই দেশজুড়ে বাজল যুদ্ধের দামামা। রেডিওর নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অস্পষ্ট যেটুকু শুনতে পারেন, তাতেই এহসানের আক্ষেপের শেষ নেই! দেশের এই দুঃসময়ে হাত গুটিয়ে বসে আছেন ভেবেই কিনা মুখ অন্ধকার করে বসে থাকতেন!
দেখতে দেখতে এই গ্রামেও চলে এলো পাকিস্তানী মিলিটারি, ক্যাম্প গাড়ল এখানকার প্রাইমারী স্কুলে। এবার আর এহসানকে ধরে রাখতে পারবেন না, জানেন জাহানারা। আশঙ্কাকে সত্যি করে এক কৃষ্ণপক্ষ রাতে বেড়িয়ে পড়লেন এহসান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে গ্রামের স্কুলেই শিক্ষকতা শুরু করেছেন সবে, টগবগে রক্ত! দেশের এই সংকট কালে লেজ গুটিয়ে ঘরে থাকার মানুষ নন উনি। যাবার আগে জাহানারাকে বাবার বাড়িতে রেখে গেলেন, মিলিটারিরা সেদিকে যায়নি এখনো।
বিদায় বেলায় বলে গেলেন,
“দেশ ডাকছে, সাড়া না দিয়ে কীভাবে থাকি বলো?”
জাহানারার মুখে কোন কথা ফুটল না, শুধু এহসানকে জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে কাঁদলেন কেবল।
প্রতিদিন কত শত মৃত্যুর খবর শুনতে শুনতে আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠত!
মানুষটা ভালো আছে তো? নাকি…
আর ভাবতে পারতেন না। ভেতরটা হুহু করে উঠত! একটা দিন কেটে গেলে মনে হতো আরেকটা সূর্যোদয় দেখা হলো! কী এক অনিশ্চিত জীবন!
দ্বিতীয় সন্তান জন্মের সময় ঘনিয়ে আসছিল, সেপ্টেম্বর মাসের কোনো এক রাতে সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে সবাই ভয়ে প্রায় মূর্ছা যাবার যোগাড়। বাড়ির সব মেয়ে একেবারে ভেতরের ঘরে ঘাপটি মেরে আছে শঙ্কিত হয়ে! ধাক্কা থামতেই পরিচিত গলার স্বরে জাহানারার ছোটভাই বেরিয়ে এসে দরজা খুলল। ভেতরের ঘর থেকে জাহানারা বেরিয়ে এসে স্থান, কাল বিস্মৃত হয়ে এহসানকে দেখতে লাগলেন আকুল নয়নে! কতদিন পর বুক ভরে শ্বাস নিলেন, বুকের রক্ত ছলকে উঠল!
“মানুষটা বেঁচে আছে!”
পরনের শার্টটা ময়লা হয়ে গেছে, মুখে দাঁড়ি গোফের জঙ্গল আর উস্কোখোস্কো চুল, তাতেও অবয়বের রাজকীয় ভঙ্গি ঢাকা পরেনি এতটুকু! সবমিলিয়ে এক মলিন রাজপুত্র যেন!
“ভোরের আগেই চলে যাব, সেপর্যন্ত কি এভাবেই দেখতে থাকবে?”
এহসানের কথায় ঘোর থেক বেরোলেন জাহানারা, ছোটভাইকে বলে গোসলের ব্যাবস্থা করে দিলেন। এরমধ্যে রাতের খাবার কিছু ছিল, সেইসাথে রান্না করতে বসে গেলেন মা। জাহানারার হাতের রান্না এহসানের ভীষণ পছন্দের বলে এই অবস্থায়ও মায়ের পাশে বসে গেলেন চুলার সামনে।
খাবার বেড়ে দিতেই এহসান খুব তৃপ্তি নিয়ে খেতে লাগল, কতদিন পরে এমন আয়েশ করে খেলেন নিজেই মনে করতে পারলেন না! জাহানারা অদ্ভূত মায়ামায়া দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকলেন! চোখ ঝপসা হয়ে আসতে থাকে ক্রমশ! সেরাতে দুজন গল্প করে কাটিয়ে দিলেন।
ভোর হবার আগে আগে তাড়া লাগান এহসান,
“আর যে সময় নেই, এবার তো যেতেই হবে। বেঁচে থাকলে দেখা হবে!”
কথাটায় ধ্বক করে কেঁপে উঠেছিল জাহানারার সমস্ত হৃদয়। সেইসাথে গর্বও ছিল। এবারও কান্নাতেই বিদায় জানালেন। কে জানত এই দেখাই ছিল শেষ দেখা!
এর দু’মাস পরেই দ্বিতীয় ছেলে আসে কোল জুড়ে, তার কিছুদিন পরেই দেশ স্বাধীন হয়, নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর সবাই ফিরতে থাকে স্বাধীনতার মশাল জ্বালিয়ে। অনেকেই হারিয়ে গেছে না ফেরার দেশে! জাহানারাসহ শ্বশুরালয়ের সকলেই অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে। মাসখানেক পরে এহসানের এক সহযোদ্ধার কাছ থেকে জানা যায়, না ফেরার তালিকায় এহসানও আছে। বিপুল সাহস বুকে বয়ে বেড়ানো ক্ষ্যাপাটে মানুষটা দেশের জন্য বীরের মতই বুক চিতিয়ে মৃত্যুকে বরণ করেছেন।
সেই থেকেই জাহানারার একলা লড়াই, সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে বয়োজ্যেষ্ঠরা বিদায় নিতে থাকে একে একে, বছর দশেক পরে জাহানারাই বনে যান সবথেকে বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য। সময় সত্যিই খুব অদ্ভুত! দুরুদুরু বুকে যেখানে পা রেখেছিলেন, সেই বিশাল বাড়ির কর্তৃত্ব এত দ্রুত তাঁর হাতে চলে আসবে এটা কখনোই ভাবতে পারেননি! এত বড়ো বাড়ির হাল ধরেন একলা হাতে। তাঁর ছোট কাঁধে বিশাল দায়িত্ব আর এক পৃথিবী একাকিত্বের বোঝা চাপিয়ে নিশ্চিন্তে ওপারে ডুব দিয়েছেন ভালোবাসার মানুষেরা! এমন কর্তৃত্ব তো জাহানারা চাননি!
এতদিন পরে সেইসব স্মৃতি মানসপটে ভেসে উঠতেই ভেতরটা কেমন যেন করে উঠে। কষ্ট, একাকিত্ব, শূন্যতা, সুখ, গর্ব সব অনুভূতি একসাথে ছুঁয়ে যায়! চোখ ভিজে উঠলেও অবয়বে ফুটে উঠে মিষ্টি এক চিলতে হাসি। আনন্দ বিষাদের এক বিচিত্র সহাবস্থান যেন! সুখস্মৃতি যে সোনা বাঁধানো!
এতকিছুর পরেও জাহানারা বড্ড একা, নিঃসঙ্গ! পাশে রাখা মুঠোফোন বেজে উঠতেই একটা দীর্ঘশ্বাস দলা পাকিয়ে উঠে আসল বুক বেয়ে।
“মা, কেমন আছ? স্যরি, কালকে খুব ব্যস্ত ছিলাম, রেহানের স্কুলে প্যারেন্টস ডে ছিল। তাই তোমাকে ফোন দিতে পারি নাই।” ওপ্রান্ত থেকে ভেসে আসে ছেলের গলা।
“নাহ্! মনে করে যে দুই একদিন পরপর খোঁজ খবর করো এই অনেক!”
অভিমান ঝরল গলায়, এই অভিমান তো ছেলেদের ছুঁয়ে যায় না! তবে কী মূল্য এর?
দুই ছেলেই পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে স্থায়ী হয়েছে। জাহানারার আপত্তি সত্বেও মাসে মাসে মোটা অংকের টাকা পাঠিয়ে আর সপ্তাহে দু-তিনবার ফোনে খোঁজ খবর নিয়েই মায়ের প্রতি দ্বায়িত্ব পালন করে আসছে ওরা অনেক বছর ধরেই। জাহানারা সেসব টাকা থেকে এক টাকাও খরচ করেননি, রেখে দিয়েছেন সযত্নে। সবটা ফেরত দেবেন বলেই। তাঁর তো টাকা পয়সার অভাব নেই, অভাব শুধু সাহচার্যের। এই বয়সে সন্তান, নাতি নাতনিকে নিয়ে মেতে থাকার কথা, অথচ ওরা কোন সুদূরে, যার যার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ততার শেষ নেই! প্রযুক্তির এই সময়েও নিয়মিত যোগাযোগের অবসর মেলে না।
এভাবেই দিন চলে যায়, রাতের আঁধার নামে। এই বাড়িতে বিধবা ননদের মেয়ে আর ছেলে থাকে আর তাদের সন্তানরা, সেইসাথে কাজের লোক, সব মিলিয়ে সতেরো জনের বসতি। দিনের বেলাটা প্রায় মুখর জনারন্য। কিন্তু তবুও ওরা আর কতটুকুই বা বোঝে তাঁকে! ভয় আর সমীহ করে বলেই একটা দূরত্ব আছে ওদের সাথে, জড়তা কাজ করে হয়তো! মনের কাছাকাছি আসা তো বহু দূরের পথ। নিজের রক্তই যেখানে বুঝতে চায়নি কোনোদিন! আর সে…
যুদ্ধ শেষে কতজনই তো ফিরল, এহসানই যে কেন ফিরল না!
রাতটা যেন নেমে আসে নিঃসীম শূন্যতা নিয়ে।
বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই একাকিত্বের দহন বেড়ে যায় কয়েক গুন! অনবরত ঝিঁঝি পোকার ডাক কানে ঝিম ধরিয়ে দেয়, ওই যে দূরে শেয়াল ডাকছে তাও তো দলবেঁধে! এই বিশাল পৃথিবীতে জাহানারাই শুধু একা, নিঃসঙ্গ! তাঁর সবটা জুড়ে শুধুই শূন্যতা! শূন্যতার যে এত ওজন এটা তাঁর থেকে ভালো করে আর কেউ উপলব্ধি করেনি কোনোদিন! জগদ্দল পাথরের চাইতেও পাথর ভার চাপিয়ে দেয় বুকে! কেমন দম আটকে আসে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়! বুক নিংড়ে বেরিয়ে আসা কান্নার জল চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে! চারপাশের মুখর জনারন্যেও যে একা, বড্ড বেশিই একা! তাঁর যে চিরকালই শূন্যতায় বসবাস।
(সমাপ্ত)

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..