এমনকি রাস্তার কানাখোঁড়া বা শারীরিক ভাবে অক্ষমদেরও ভিক্ষা দেইনা এখন আমি। কারণটা বর্ণনা করছি আজ।
২০২০ এ যখন করোনা মহামারীতে পৃথিবী পুরোপুরি থমকে গেলো আমি তখনও বাসার বিভিন্ন কেনাকাটা বা অন্যান্য প্রয়োজনে রাস্তায় বেরিয়েছি (অবশ্যই সব নিয়ম মেনে)। রাস্তায় বেরিয়ে যে ব্যাপারটা আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিতো তাহলো পথশিশু এবং পথে থাকা প্রাণীদের মানবেতর জীবন। আহা! মানুষ নাই, খাবার নাই। যাকেই পেতাম সাধ্যানুযায়ী সাহায্য করার চেষ্টা করতাম।
এমনই একদিন এক নারী ভিক্ষাপাত্র হাতে, কোলে ঠিক দেড়/দুই বছরের এক শিশু নিয়ে আমার সামনে এলো। শিশুটির চোখেমুখে ক্ষুধা। তখন আমার ঘরেও একই বয়সী শিশু, আমার মেয়ে টিমটিম। মুহুর্তেই আমার চোখে ভেসে উঠলো আমার কন্যার মুখ। সে বললো তার মেয়ে আজ অনেকদিন যাবত খেতে পারেনা, খাবার নাই, কোনোরকমে এর ওর খেয়ে ফেলে দেয়া খাবার খেয়ে বেঁচে আছে৷ আজ খাবার না দিলে এই বাচ্চা বাঁচানো সম্ভব না। দুধ খায় সে, কিন্তু দুধ কেনার টাকা নেই ইত্যাদি। তার মুখে সব শুনে আমি ব্যাগে হাত দিয়ে দেখি সব কেনাকাটা শেষে আমার পকেটে তখন মাত্র আর ২০০/৩০০ টাকার মতো আছে। তাকে সাথে করে নিয়ে গেলাম মুদি দোকানে। ছোট্ট বাচ্চাটির জন্য প্রয়োজনীয় যা যা লাগে কিনে দিলাম। কেনার সময় বাচ্চাটা ওর মায়ের কোল থেকে জিনিস গুলো ধরে ধরে দেখছিলো আর মুখে দিচ্ছিলো। কেনাকাটা শেষে বিল আসলো ৭৩০ টাকা৷ আমি বাকি টাকার জন্য হাজব্যান্ডকে ফোন দিলাম এবং বিকাশে টাকা এনে বিল দিলাম। সেই মায়ের আনন্দ দেখে আমিও আনন্দিত। দোয়া করলেন মন ভরে। কিন্তু আমি দোয়ার আশায় করিনি বা করিনা এসব। আমার উদ্দেশ্যই ছিলো কারো পেটে অন্ন দেয়া। এসব দোয়া, আশীর্বাদ আমার প্রয়োজন নেই। আজ বাচ্চাটা পেট ভরে খাবে এটা ভেবেই মনে এক অদ্ভুত তৃপ্তি কাজ করছিলো আমার, সাথে ভীষণ আনন্দ৷
বাসায় এসে ঘটনাটা কাউকে জানাইনি। জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি। হঠাৎ খেয়াল হলো আমি ভুলে মুদির দোকানে আমার ছাতাটা ফেলে এসেছি। বিকেলে আবার বের হয়ে গেলাম ছাতা আনতে। ছাতাটা পেয়ে গেলাম। চলে আসার সময় বিক্রেতা আমাকে পেছন থেকে ডাকলেন৷ তিনি আমাকে একটা পলিথিনের প্যাকেট দেখিয়ে বললেন, “এটা চিনেছেন?”। আমি একটু অবাক হলাম এটা তো সকালে আমি যা যা দ্রব্যসামগ্রী ওই নারীকে কিনে দিয়েছিলাম সেসবই। ভীষণ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, উনি নেননি এটা?? দোকানী জানালেন, “আপনি চইলা যাওনের পর ওই মহিলা এইটা আবার আমার দোকানে ৫০০ টাকা দিয়ে বিক্রি কইরা দিয়া গেসে আপা”। আমি কী বলবো আর কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শুধু বললাম, “উনি বিক্রি করতে চাইলেই আপনি নেবেন কেন? আপনি তো জানতেন এতে উনার বাচ্চার খাবার আছে”। উত্তরে উনি বললেন, “আপা ওই মহিলারে যখন কইলাম, ওই আপায় এইগুলা তোমারে দান করসে তুমি বেচবা ক্যান? সে কইলো এইগুলা আমার লাগবোনা, আপনে না কিনলে এইগুলা আমি অইন্য দোকানে বেইচা দিমু। এই কথা শুইনা আমিই রাইখা দিলাম আপা।”
আমি আর একটা শব্দও বলিনি। মানে বলার মতো কিছুই আমার ছিলোনা। আমি কি কষ্ট পাচ্ছি, নাকি অবাক হচ্ছি, নাকি রেগে যাচ্ছি? কোনোপ্রকার অনুভূতিই উপলব্ধি করতে পারছিলাম না। শুধু কয়েকটা প্রশ্ন বারবার আমার ভেতরটাকে জর্জরিত করছিলো তাহলো, মানুষ এতো নিষ্ঠুর কেন? কীভাবে পারলো সে এটা করতে! বাচ্চাটা আসলেই কি ওই নারীর? বাচ্চাটা আজ কী খাবে? সেই থেকে বন্ধ হলো আমার ভিক্ষা দেয়ার প্রচলন। আমি আর কাউকে ভিক্ষা দেইনা। প্রয়োজনে একসাথে বসিয়ে খাবার খাওয়াই। কিন্তু ভিক্ষা আমি দেইনা, দেবোও না।
পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে বড় প্রতারক অন্যকোন প্রাণী নয়। মানুষের চেয়ে অধিক হিংস্রও অন্যকোনো পশু নয়।
Leave a Reply