ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণ হওয়া সত্বেও ৭ মাস বয়সী শিশু ফারজানা পায়নি পিতা ও ধর্ষিতা কিশোরি মাতা ফাতেমাকে দেয়নি স্ত্রীর স্বীকৃতি! লম্পট ধর্ষক জৈবিক পিতা আলাউদ্দিন আদালত থেকে জামিন নিয়ে, বাদিনিকে হত্যার হুমকি দিয়ে- চোরাই পথে বিদেশে পাড়ি জমানোর পথ খুঁজছেন। প্রাণনাশের আশঙ্কায় দিশেহারা ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়ানো বাদিনী, আসামির জামিন বাতিলসহ ন্যায় বিচারের দবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন।
বিস্তারিত তথ্যানুসন্ধান করে জানা যায়, মামলার বাদিনী মোছাম্মৎ ফাতেমা খাতুন (১৬), চুয়াডাঙ্গা জেলা সদর শংকরচন্দ্র মহল্লার খেদের আলীর মেয়ে। তার মায়ের নাম মোসাম্মৎ মর্জিনা বেগম।
এবং মামলার আসামী আলাউদ্দিন (৪৫) চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার খাসবাগুন্দা গ্রামের রমজান আলীর ছেলে।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, বাদিনীর দরিদ্র পিতা খেদের আলী সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গেলে।
সাংসারিক অভাব-অনটনের যাতাকলে পিষ্ট তার স্ত্রীর মর্জিনা বেগম। ১৩ বছর বয়সী মেয়ে ফাতেমাকে, ঢাকা মিরপুর মডেল থানাধীন ছাপাখানার মোড়ের বসবাসরত, বাদিনীর চাচাতো ভাই শামসুর রহমানের বাসার কাজ ও বাচ্চা দেখাশোনা করতে পাঠান।
জানা যায় মামলার আসামী মোঃ আলাউদ্দীন, বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক করতে ঢাকা আসা যাওয়া করতেন। শামসুর রহমানের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ার সুবাদে তিনি নিয়মিত মিরপুর বাসায় আসা যাওয়া এবং রাত্রি যাপন করতেন। বাসার গৃহকর্তা ও গৃহকর্তী স্বামী-স্ত্রী দুজন ঢাকায় চাকরি করেন। তারা তাদের দুই সন্তানকে স্কুলে দিয়ে, বাদিনী ফাতেমাকে বাসায় একা রেখে কর্মস্থলে চলে যান।
প্রতিদিনের ন্যায় ১৫ ফেব্রুয়ারি-২০২৪ তারিখ সকাল অনুমান ০৮:০০ ঘটিকার সময় গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রী দুই বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে, ফাতেমাকে বাসায় একা রেখে কর্মক্ষেত্রে চলে যান।
সেসময় আলাউদ্দিন বাসায় প্রবেশ করেন। সেসময় ফাতেমা খাতুন বারান্দায় বসে ছিলেন। এ সময় আসামী তাকে কাজের কথা বলে, ঘরের ভেতর ডেকে নিয়ে কুপ্রস্তাব দিয়ে বলেন, তিনি প্রবাস থেকে এসেছেন ও সম্প্রতি আমেরিকা চলে যাবেন। যাওয়ার সময় তিনি ফাতেমাকে তার সঙ্গে আমেরিকা নিয়ে যেতে আগ্রহী। তার আগে আলাউদ্দিন তাকে জমি-সম্পত্তি লিখে দিয়ে বিয়ে করবেন। আলাউদ্দিন ফাতেমার কাছে এমন লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে বসেন। কিন্তু বাদিনী ওই অশালীন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায়, আলাউদ্দিন ফাতেমার গলায় ছুরি রেখে, ভয় ভীতি প্রদর্শন করে এবং তার পরনের সেলোয়ার কামিজ টেনে-হিচরে খুলে, জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন।
এর পর থেকে উক্ত আলাউদ্দিন গৃহকর্তা, গৃহিণী ও বাচ্চাদের অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন সময়ে ওই বাসার প্রবেশ করতেন। নারী লোভী আলাউদ্দিন বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ও নেশা জাতীয় ঔষধ খাইয়ে, বার বার ধর্ষণ করতে থাকেন। এ বিষয়ে আলাউদ্দিন ফাতেমাকে ভীতিপ্রদর্শন করে বলেন, এসব ঘটনা কারো কাছে প্রকাশ করলে তিনি তাকে প্রাণে মেরে ফেলবেন বলে, হুমকি দিতে থাকেন। আলাউদ্দিনের প্রাণ নাশের হুমকির কারণে অসহায় কিশোরী মেয়ে ফাতেমা, বিস্তারিত ঘটনা করো কাছে প্রকাশ করতে সাহস পাননি।
এভাবে আসামি আলাউদ্দিন সর্বশেষ গত ৮ মে-২০২৪, বেলা আনুমানিক ১১ টার সময় বাসার মালিকের অনুপস্থিতে, বাদিনীকে শয়ন কক্ষে উপর্যুপরি ধর্ষণ করার পর ফাতেমা অন্তঃসত্তা হয়ে পড়েন। তখন ফাতেমা বাধ্য হয়ে আলাউদ্দিনের হুমকি-ধামকি উপেক্ষা করে, এসব কথা বাসার ও তার পরিবারের সবাইকে জানালে, আলাউদ্দিন গাঁঢাকা দেন।
এ পরিস্থিতিতে ফাতেমার গৃহকর্তা ও পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ ও অসহযোগিতায়, বাদী হয়ে ৯ জুন-২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে, ঢাকাস্থ মিরপুর মডেল থানায়, অভিযোগ পত্র নং: ১০৪, তারিখ: ১৭ মার্চ, ২০২৫ ধারা: ৯(১) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০); অভিযোগ দাখিল করেন।
বাদিনির অভিযোগের ভিত্তিতে অফিসার ইনচার্জ এস.আই (নিরস্ত্র) কানিজ ফাতেমা উক্ত মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন। মামলার সরেজমিনে পরিদর্শন করে ঘটনাস্থলের চৌহদ্দী নির্ণয়, খসড়া মানচিত্র অঙ্কন সূচিপত্র প্রস্তুতসহ বিভিন্ন আলামত জব্দের চেষ্টা করেন। বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ, সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে উক্ত মামলা ঢাকা সিএমএম আদালতে এ পরিচালনার জন্য আবেদন করে। আদালত এজাহারভূক্ত আসামী আলাউদ্দিনের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। আদালতের নির্দেশ পেয়ে পুলিশ আলাউদ্দিনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালায়।
মামলার সততা নিশ্চিত ও ন্যায় বিচারের প্রয়োজনে উক্ত আদলত, ভিকটিমের ধর্ষণ পরীক্ষাসহ ডিএনএ প্রোফাইল করার জন্য, ঢাকাস্ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগকে নির্দেশ দেন। আদলতের নির্দেশে ফরেনসিক ও মেডিসিন প্রভাষক ডাক্তার ফাতেমা জাহান বারী ভিকটিম মোসাম্মৎ ফাতেমা খাতুনের ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন।
মাইক্রোবায়োলজিকাল আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টগুলি বিবেচনা করে তিনি জানান, আমার মতামত রয়েছে যে ‘এমএসটি ফাতেমা খাতুন’ নামে পরিচিত ভুক্তভোগীর যৌন মিলনের লক্ষণ রয়েছে যা সাম্প্রতিক নয় এবং প্রায় ১৩ তম সপ্তাহের একক লাইভ গর্ভাবস্থার একটি ঘটনা। যে তথ্য সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল তারিখ ৭ ডিসেম্বর-২০২৪, মেমো নং ১৯৩১/২০২৪ ভিসি-১৭৭/২৪ এ প্রমাণপত্রে রয়েছে।
গত ৯ ডিসেম্বর-২০২৪ তারিখে ফাতেমার গর্ভে শিশু ফারজানার জন্ম হয়।
মামলা হওয়ার পর আসামী দীর্ঘ প্রায় ৪ মাস সময় গাঢাকা দিয়ে থাকে এবং সুযোগ বুঝে চোরাই পথে বিদেশে চলে যান। কিন্তু তার কাঙ্খিত দেশে পৌছাতে ব্যর্থ হয়ে পুনরায় দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হোন। গত ২৫ সেপ্টেম্বর-২০২৪ তারিখে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে ইমিগ্রেশন পুলিশ আলাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে প্রেরণ করে।
অতপর আদালত মামলার আসামি ও ভিকটিমের ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ প্রদান করে। পরীক্ষক নির্ধারিত সময়ে দীপঙ্কর দত্ত ডিএনএ পরীক্ষক
এ রিপোর্ট প্রদান করেন। প্রাপ্ত রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, আসামি ও ভিকটিমের ডিএনএ পরীক্ষান্তে ব্যাখ্যা/মন্তব্য করেন যে, ডিএনএ পরীক্ষায়, সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণীত হয় যে, মোঃ আলাউদ্দীন, মোছাঃ ফাতেমা খাতুনের গর্ভজাত সন্তান ফারজানা’র জৈবিক পিতা।
সুত্র: ফরেনসিক ডিএনএ লেবরোটারি অব বাংলাদেশ পুলিশ সিআইডি কার্যালয়ের মোমো
তারিখ ২৩ জানুয়ারি-২০২৫, মেমো নং- ২৪-০৩৮১৪/১ ।
এ আসামি আলাউদ্দিন দীর্ঘ ০৯ মাস জেল হাজতে আটক থাকার পর, সম্প্রতি তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্তি লাভ করেন।
মামলার বাদিনী ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে, মামলার আসামি আলাউদ্দিন ফাতেমার পথরোধ করে এই বলে হুমকি দেন যে, রায়ের আগেই মামলা তুলে নিবি। তানা হলে তুই ও তোর বাচ্চাকে হত্যা আমি বিদেশে চলে যাব।
এ হুমকির প্রেক্ষিতে দরিদ্র পরিবারের অসহায় কিশোরি মাতা ফাতেমা খাতুন, চোখের জলে ভেসে প্রতিবেদককে জানান, আমি এখন প্রাণনাশের ভয়ে দিশেহারা। এ অবস্থায় আশঙ্কায় আছি, সে যেকোনো সময় আমি ও আমার সন্তানকে হত্যা করে বিদেশে পালিয়ে যাবে। দিশেহারা আমি বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছি ও অনেক ভয়ে ভয়ে আছি।
জানা যায়, ভদ্রতার লেবাসদারী, ধুরন্ধর নারী লোভী ও প্রতারক আলাউদ্দিন। সে এলাকার অত্যন্ত ক্ষমতাধর প্রতাপ ও প্রভাবশালী মানুষ।
সে সিঙ্গাপুর থাকা অবস্থায় অনৈতিক কাজের অভিযোগ তাকে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। এ ঘটনার আক্রোশে দূর্ধর্ষ আলাউদ্দিন এখন প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে। সে যেকোনো সময় মামলার বাদিনী ও ৭ মাস বয়সী শিশু এবং পরিবারের সদস্যদেরকে বড় ধরণের ক্ষতি করে, চোরাই পথে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন। এ আশঙ্কায় মামলার বাদিনী মোসাম্মৎ ফাতোমা খাতুন চুয়াডাঙ্গা জেলার, আলমডাঙ্গা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে মামলার আসামী আলাউদ্দিনের জামিন বাতিল করে, কারাগারে রাখাসহ ন্যায় বিচারের দাবি জানান।
এ প্রতিবেদন লেখার আগে মামলার আসামী আলাউদ্দিনের অভিমত নেয়ার ব্যাপারে, মুঠো ফোনে বার বার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
Leave a Reply