‘আমার সে প্রেম আমাকে ফিরিয়ে দাও………’! ১৯৭০ সালে নির্মিত ফিল্মের একটি গান- এটি। গানটি- ‘বিনিময়’ ছায়াছবির! এটা গেয়েছিলেন মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার, সুর করেছিলেন সত্য সাহা। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন সুভাষ দত্ত। গানটির দৃশ্যায়ন হয়েছিল নায়ক উজ্জলকে ঘিরে। সে গানের দৃশ্যায়ন আর ব্যর্থ প্রেমিকের হাহাকার দেখে চোখ মুছতে মুছতে সেদিন বাসায় ফিরেছিলাম সন্ধ্যাবেলা।
স্কুল পালিয়ে তখোন ‘ম্যাটিনি-শো’ই (বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যে ৬টা) দেখতাম বেশী। কারন সন্ধ্যার মধ্যেই বাসায় ফিরে পড়ার টেবিলে বসতে হতো। নইলে একমাত্র চিকিৎসা- ‘মাইর’ চলতো যথা নিয়মে, বিনা বাক্যব্যয়ে!
১৯৭০ সালে আমি তখোন মেট্রিকের ছাত্র। প্রেম তো প্রেম, সেই ইচড়ে পাকা বয়সে প্রেমের বাপ-দাদাসহ বুঝে গিয়েছিলাম কেমন কেমন করে জানি 🙂 ! সুতরাং এই গানের ‘শা’নে নজুল’ কিংবা ‘ফজিলত’ বুঝবোনা- এমনটি হবার কথা নয়!
আর বুঝবোই বা না কেনো! ক্লাস নাইনে পড়াকালেই তো প্রেমে পড়েছিলাম ক্লাসের দুই সহপাঠীর সাথে! সেই প্রেম ধরা পড়ে কী পরিমান মার খেয়েছিলাম বড়ো ভাইয়ের হাতে- সে কাহিনী ফেসবুকের দেয়ালে একাধিকবার লিখেছি! থাক ওসব। আমার এই ছবিটির কথায় আসি।
কোন এক ফাঁকে আমার এই ছবিটি ফেসবুক থেকে চলে গিয়েছে আমার এক অনুরাগীর কাছে। অনুরাগী এই মেয়েটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ব্যাচ-মেট (১৯৭৮- ’৮৪ সাল) ছিল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, আকারে ইঙ্গিতে আমাকে তার ভালো লাগার কথাটি জানিয়েছে কয়েকবার! কিন্তু আমার নজর তো তখোন ‘অন্যকোথা, অন্য কোনখানে’ 🙂 ! ফলে আর ‘ব্যাটে-বলে’ হয়নি! কিন্তু ঘটনাটি ওখানেই শেষ হয়ে যায়নি……!
আমার এই ছবিটি ইনবক্সে পাঠিয়ে সে লিখেছে- ‘আমার সে প্রেম আমাকে ফিরিয়ে দাও…; দূঃসহ ক্লান্তিতে আমার ভূবন ছেয়ে- কী সুখ বলো পেতে চাও, সে প্রেম ফিরিয়ে দাও……!’ বুঝুন ল্যাঠা 🙂 ! ৪৫ বছর আগের মামলা! তরুণ বয়সের সেই ‘ঠোকাঠুকি’- ভুলেইতো গিয়েছিলাম প্রায়! সেই ৪৫ বছর পরে এসে মেয়ে বলে কীনা- ‘আমার সে প্রেম আমাকে ফিরিয়ে দাও………’!
আরে বাবা, প্রেম কি কোন গয়নার বাক্স, এটা কি সিন্দুকে রাখা যায়!? প্রেমটা কি তুমি আমার কাছে বন্ধক রেখেছিলে যে- তুমি চাওয়া মাত্রই আমি সিন্দুক খুলে ‘তোমার প্রেম’ তোমার হাতে তুলে দেবো! প্রেম কি বাংলাদেশ ব্যাংকের নোট- ‘চাহিবা মাত্র বাহককে দিতে বাধ্য থাকিব’!
দেখো ভাই, তোমার আমার ‘উদ্ভূত’ এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্যেই হয়তো জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন-
‘জীবন গিয়েছে চ’লে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার—
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!
তখন হয়তো মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেঁচা নামে—
বাবলার গলির অন্ধকারে
অশথের জানালার ফাঁকে
কোথায় লুকায় আপনাকে!
চোখের পাতার মতো নেমে চুপি কোথায় চিলের ডানা থামে—
সোনালি-সোনালি চিল— শিশির শিকার ক’রে নিয়ে গেছে তারে—
কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে!’
জীবনানন্দ বাবু তো ‘কুড়ি’ বছরের কথা বলেই খালাস! কিন্তু তোমার আমার তো পেরিয়ে গেছে ৪৫ বছর। এখন বলো- কোথায় পাবো তারে!?
জীবনানন্দ বাবু নিজেই তো বললেন- ‘শিশির শিকার ক’রে নিয়ে গেছে তারে—’! যে বিষয়টাকে শিশির শিকার করে নিয়ে যায়- এখন আমি তারে আর কেমন করে, কোথায় পাই বলো!
সঙ্গীহীন, নিস্তরঙ্গ এই জীবনে ‘তোমাকে’ কিছুটা পেলে অবশ্য মন্দ হতো না! কিন্তু সেটাতো আর সম্ভব নয় গো! তোমার সোয়ামী আর সন্তানদের অভিশাপেই তো ‘ভষ্ম হয়ে যাবো মোরা’ 🙂 ! তার চাইতে সে-ই ভালো; থিম-সং হিসেবে আমাদের জীবনে ওই গানটিই বরং বাজিয়ে দেই- ‘আজ দু’জনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে………… 🙂 !
তবুও ভালো থেকো অনামিকা, অনেক ভালো। যদি সেটা না-ই পারো, তাহলে ভালো থাকার অভিনয়টুকু অন্তত করে যাও বাকী জীবনে! জীবন আসলে অমনই; বড়ো ধোঁয়াশাময়, অভিনয়ে ভরা!
তারাশংকর বন্দোপাধ্যায় লিখেছিলেন না-
‘এই খেদ আমার মনে –
ভালবেসে মিটল না সাধ,
কুলাল না এ জীবনে।
হায় –
জীবন এত ছোট কেনে ?
এ ভুবনে?’
——————————————–
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে এই ছবিটি তোলা হয়েছিল- ঢাকা নিউ মার্কেটে ‘আকস স্টুডিও’তে (সম্ভবত)!
Leave a Reply