সময়মতো কোচিং ফি না দিতে পারায় স্যারের কাছে প্রতিদিন প্রতিদিন মার খায় রাতুল। আজকেও বাবা টাকা দেয়নি। কাঁধে ভারী ব্যাগ নিয়ে রাশেদ স্যারের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। ঘরের ভেতর থেকে ছাত্রদের পড়ার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। রাতুল ভেতরে যাবে ভেবে এক পা এগিয়ে দু’পা পিছিয়ে যায়। সে জানে, টাকা না পেয়ে স্যার তাকে ইচ্ছেমতো পিটাবেন। কিন্তু তবুও তাকে ভেতরে যেতে হবে, সবার সাথে পড়তে হবে। পড়াশোনার প্রতি তার খুব ঝোঁক। তবে সবাই বলে তার নাকি মেধা নেই।
স্যার তখন গভীর মনোযোগ দিয়ে কী একটা বই পড়ছিলেন। সামনে তিনি বিসিএস দেবেন। স্যারের চারপাশে বসে থাকা সবাই খাতায় লিখছিল তখন রাতুল উঁকি দিতেই সবার মনোযোগ পড়ল তার উপর। এখানে শুধু রাতুল নয়, উপস্থিত সবাই জানে স্যার আজকে রাতুলকে বেধড়ক পেটাবেন। কারণ তিনি কাল লাস্ট ওয়ার্ণিং দিয়েছেন। আজ বেতনের টাকা এনে দিতে না পারলে রাতুলকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে।
এসছিস?বইয়ের ভেতর থেকে চোখ না তুলেই বলেন রাশেদ স্যার। রাতুল হা হু কোনো জবাব না দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার হাঁটু কাপছে, বুক কাঁপছে। কেমন একটা দমবন্ধ ভাব আছে তার বুকের ভেতর।
স্যার এবার চোখ তুলে শীতল গলায় বললেন,কথা কানে যায় না?ঠিক তার পরই চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন, প্রশ্ন করেছি উত্তর দিতে পারিস না?
এক ধমকে রাতুলের প্রাণপাখি ছটফটিয়ে উঠল। আজ যে কী হবে তার!
ছেঁড়া প্যান্ট পরেছিস কেন? বললেন রাশেদ স্যার। রাতুল এক হাতে প্যান্টের ছেঁড়া জায়গাটা আড়াল করে নিলো। কিন্তু তাতেও রক্ষা হলো না৷ স্যার উঠে এসে রাতুলের কান টেনে ধরে বললেন,প্রশ্ন করলে উত্তর দেস না কেন? ঘাড়ত্যাড়া হয়ে গেছিস? পিটিয়ে তোর ত্যাড়ামি আমি বের করে দিব!
কান লাল হয়ে রাতুলের চোখে জল এসে গেছে। সে দুহাতের পিঠ দিয়ে জল মুছছে। স্যার গিয়ে বসেছেন নিজের জায়গায়।
আর কোনোদিন ছেঁড়া প্যান্ট পরে কোচিং-এ আসবি না। যা ওই কোণে গিয়ে বোস।
এক কোণে বসে সময় গুণছিল রাতুল। সে হোওম ওয়ার্ক করে এসেছে, যা যা পড়া দেওয়া হয়েছিল সব শিখে এসেছে তবুও আজ মার খাবে। কারণ সে টিউশানির টাকা আনেনি। দুমাসের মোট এক হাজার টাকা বাকি। বাবা আজকেও টাকাটা দেয়নি। বলেছে, এখন আমার কাছে এত টাকা নাই। পড়লে পড় না পড়লে বাদ দে। রিকশা চালা। আমি অত টাকা দিয়ে পড়াতে পারব না।
কিন্তু রাতুলের পড়তে ভালোলাগে। তাই মার খাবে জেনেও সে এসেছে। আবার এখানে না এলেও সে বেঁচে যেত তা কিন্তু নয়। রাশেদ স্যার আবার রাতুলদের স্কুল টিচার। কোচিংয়ে না এলে স্কুলে পেয়ে দ্বিগুণ পেটাবেন। সুতরাং বাঁচার কোনো উপায় নেই।
স্যারের নজর যখন রাতুলের উপর পড়ল তখন সে খাতায় আঁকিবুঁকি করছে যাতে টেনশান কমানো যায়। স্যার হঠাৎ তাকে বলে উঠলেন,কী করছিস রে? পড়া দে।
পড়া দে কথাটির মাঝে যে শুধু পড়া দেওয়ার ব্যাপার নয় সাথে অন্য কিছুও আছে তা ভালো করে জানে রাতুল। টাকা না আনায় স্যারের যা রাগ আছে পুরোটা তিনি পড়া নেওয়ার নাম করে শোধ করবেন। সরাসরি তো বলা যায় না যে, টাকা আনিসনি তাই পিটাচ্ছি! এজন্য পড়া চাইবেন। যেখানে আটকে যাবে সেখানেই শুরু হবে বেধড়ক মার। এরপর ততক্ষণ বেত চলবে যতক্ষণ না স্যারের রাগ কমছে।
রাতুল পড়া দিলো। স্যার যা যা জিজ্ঞেস করলেন সব পারল। যা যা লিখতে দিয়েছিলেন সবই লিখে দিলো। কোথাও আটকাল না। অবশেষে স্যার আসল কথাটা বললেন,
টাকা এনেছিস?
সহসা রাতুলের গলা শুকিয়ে গেল। সে প্রতিদিনের মতো ভীত চোখে স্যারের দিকে তাকিয়ে রইল। পা দুটো থরথর করে কাঁপতে শুরু করল তার। মিনমিন করে কী যেন বলতেই যাচ্ছিল তার আগেই স্যারের লাঠির আঘাত পড়ল তার গায়ে।
কথার জবাব দিতে পারিস না বেয়াদব?বলে চেঁচিয়ে উঠে কয়েক ঘা বসিয়ে দিলেন। রাতুল চুপ করে সহ্য করছে দেখে স্যার আরো রেগে গেলেন। থেমে গেলেন। থমথমে গলায় বললেন,তুই কাল থেকে আর পড়তে আসবি না।
এরপর থেকে আর স্যারের বাসায় পড়তে যায়নি রাতুল। মাসখানেক পর যখন পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশিত হলো তখন সবার মুখে হাসি। রবিন, আশরাফ, বাহার, পলাশ, সিফাত, কাওসার সবাই ভালো নম্বর পেয়েছে। রাশেদ স্যারের সাবজেক্টে ওরা সবাই এ প্লাস পেয়েছে। রাশেদের রেজাল্টও ভালো হয়েছে। শুধু রাশেদ স্যারের সাবজেক্টে সে ফেল করেছে। ফেল করার কারণ অবশ্য আছে। স্যার এমন কঠিন কঠিন প্রশ্ন করেছেন যে রাশেদ ঠিক করে উত্তর দিতে পারেনি। কিন্তু স্যারের ছাত্ররা কীভাবে এ প্লাস পেয়ে গেল তা ভেবে পাচ্ছে না রাতুল। যদিও কাওসার তাকে একবার কানেকানে বলেছে, স্যার ওদেরকে যা পড়িয়েছেন তাই নাকি পরীক্ষায় এসেছে। এমনকি পরীক্ষার আগেরদিন নাকি স্যার সবাইকে প্রশ্ন দিয়ে বলেছেন,এগুলো পড়, কমন পড়বে।
বত্রিশ নম্বর পাওয়া খাতাটা নিয়ে ভয়েভয়ে রাশেদ স্যারের সামনে দাঁড়ায় রাতুল। একটি নাম্বার দিলেই সে পাশ করে যাবে। এক নামার দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতেই স্যার ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, লজ্জা করে না! ফেল করে আবার আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিস! যা এখান থেকে!
খুবই মন খারাপ করে ফেল করা খাতা নিয়ে বাড়ি ফিরছিল রাতুল। হঠাৎ রাশেদ স্যারের হাতটা কাঁধের উপর আবিষ্কার করল রাতুল। ঘুরে তাকাতেই স্যার রাতুলের কানে কানে বললেন,
ফেল করেছিস তাই কষ্ট হচ্ছে? বাপের কাছ থেকে গালি শুনবি নিশ্চয়ই? তুই এক কাজ করিস,আগের পাওনা টাকা নিয়ে কাল আমার বাসায় চলে আসিস। আমার কাছে পড়বি। পরেরবার পাশ করিয়ে দেব।
এ জাতীয় আরো খবর..
Leave a Reply