একটু খানি ঊষ্ণতা = নারগিস আখতার কনক

সর্বশেষ সাহিত্য

 

একটু খানি ঊষ্ণতা
নারগিস আখতার কনক

আকাশে হালকা হালকা মেঘ করেছে, মনে হচ্ছে বৃস্টি হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাতাসে মেঘগুলো ধীরে ধীরে কেটে পরছে। এমন মেঘলা দিনে সকালে গরম চায়ে চুমুক দিতে ভালই লাগছে, আর সঙ্গে লো ভলিয়মে রবি ঠাকুরের গান।
ঘড়িতে সকাল ৭ টা। ফোন বেজে উঠলো-সব ঠিকতো? যাবেত? ট্রেনের কক্ষ বুকিং, টিকিট এসব কাটতে হবে। নিলয় সাহেব একটানা বলে চলল কাপা কাপা ঘুম ভাঙ্গা কন্ঠে। নাকি সারা রাত ঘুমায়নি তা কে জানে।
-কান্তা,কনফিউশন এর মাত্রা বাড়ানোর জন্য দুষ্টুমি করে ১মিনট চুপ থেকে ছোট্ট করে হ্যা বলল। হ্যাঁ বলতে গিয়ে কান্তার গলাটা কেপে উঠলো, দ্বিধায় পরা এর জন্য না, আত্মবিশ্বাসের জন্য। কান্তা আজ পর্যন্ত, ছেলে বন্ধুদের সাথে পাশাপাশি বসে আড্ডা দেয়নি,খুব প্রযোজন ছাড়া এক রিকসায় উঠেনি।
২ বছরের ফেসবুক ফ্রেন্ড নিলয় সাহেবের সঙ্গে কক্সবাজার, যেতে রাজি হয়ে গেলো। মনের অবাধও ভাল যাচ্ছিল না। ব্রেক আপ এর বয়স ২ বছর হলেও মন খারাপ এর দিন গুলিতে আরও বেশি উকি দিয়ে উঠে। নি:সঙ্গতকে বাড়িয়ে তুলে অনেকগুণ। বাসায় ও ঝামেলা চলছে কান্তার,বাবা মা র মধ্যে সম্পর্ক ভাল যাচছে না। পড়াশুনাতেও মন বসছে না। এত মানুষিক চাপে কান্তা নিঃসঙ্গতা কাটাতে নিলয় সাহেব এর সাথে ফেসবুকিং এর মাত্রা ইদানিং বাড়িয়ে দিয়েছে।
এমন নিঃসঙ্গতার দিনে কান্তার সাহিত্যিক মন প্রকৃতিকে আপন করে মন ভোলাতে চায়। কান্তার খুব ইচ্ছে টিপ টিপ বৃষ্টিতে সমুদ্র সৈকতে গিয়ে উদাস মনে বৃষ্টি বিলাস করবে। জ্যোৎস্না রাতে নীল শাড়ী পরে সমুদ্র সৈকতে হাটবে, মনের মধ্যে গুন গুন করবে রবিঠাকুরের গান চাঁদের হাসি বাঁধ ভেংগেছে।
আর কলাতলি পয়েন্ট দিয়ে যাওয়ার সময় সেই গানটি আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে। ঝাঁউ বনের ফাঁক দিয়ে চাঁদ উকি দিয়ে আলো ছড়াবে। আর আলো আধাঁরের খেলা খেলবে। সমুদ্রের একদল ঢেউ তাদের দু:খ ও জমানো কস্টগুলোকে নিয়ে যেতে আসবে, তারপর কোথায়ও যেন মিলে যাবে।
আজ তার যাবার সু্যােগ হচ্ছে। বাসায় স্টাডি ট্যুরে কক্সবাজার যাবার কথা বলে গত রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছে। দুজনেই দুজনের শর্ত নিয়ে যাচ্ছে। তাতে কান্তা কতোটুকু বেদনামুক্ত হতে পারবে তা কান্তা জানেনা। হতাশা আর উদাসিনতা এক হয়ে,,,ঠিক বেঠিক খুব একটা চিন্তাটাও করতে যেন সে রাজি না। নিলয় সাহেব এতোদিন এই সুযোগ টাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টায় সফল হয়েছে।
রাত্রি ১০ টা বাজে ট্রেন। কান্তার নিলয় সাহেব মাঝে অল্প দূরত্ব রেখে পাশাপাশি বসে অপেক্ষা করছে প্লাটফর্মে।কান্তা হাল্কা থ্রিপিস এর উপরে হাল্কা চাদর জড়িয়ে বসে আছে। উদাস চোখে ট্রেন আসার অপেক্ষা করলেও বুঝতে পারছে নিলয় সাহেব বার বার তাকে আপাদমস্তক দেখছে।
ঘড়িতে ১০টা ৫ মিনিট। ৫ মিনিট দেরিতে ট্রেন এসে থামল। কেবিনে টিকিট পায়নি বলে চেয়ার কোচে যেতে হলো তাদের। এতে নিলয় সাহেবের মন কিঞ্চিত ভার ছিল। তবে পুরো যাত্রায় কান্তার প্রতি টেক কেয়ারের অভাব রাখেনি নিলয় সাহেব। মাঝে মাঝে প্রেমিকের মতো আচরণ কান্তার নিঃসঙ্গ দুর্বল মনকে বারবার এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু নিলয় সাহেবের দেওয়া শর্তগুলো কান্তার মনকে জানান দিয়ে গেল এসব সাময়িক,মনকে গুটিয়ে ফেল। নিলয় সাহেবের মার্বেল আকৃতির চোখ আর দুস্টমিস্টি হাসি যেকোন মেয়েকে প্রেমে ফেলার শক্তি রাখে। কান্তার বার বার শর্তের কথা মনে পড়ে নিজেকে গুটানোর চেস্টা করল। রাত প্রায় ২ টা ট্রেন ঝিঁক ঝিঁক শব্দে দ্রুত চলছে। দুইজনের চোখে ক্লান্তি নেমে এসেছে।
নিলয় সাহেব অনেকটা ঘুমের মধ্যে চলে গেছে। কান্তা নিজের হাতটা আস্তে করে নিলয় সাহেবের হাত থেকে বের করে জানালার দিকে চেপে বসলো। খুব ভোরে তারা কক্সবাজার পৌছায় গেলো।ট্রেন থেকে নেমে কান্তা যত সামনে অগ্রসর হয় ততই মনের মধ্যে ভয় ভর করতে থাকে।
এর আগে নিলয় সাহেবের সাথে দু তিন বার ফরমালি দেখা হয়ছে। কেউ কারো পার্সোনাল ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায়নি। নিলয় সাহেবের প্রতি বিশ্বাস আর শর্তের কথা চিন্তা করে সামনে এগিয়ে চলল কান্তা।
তারা ৫ তারকা হোটেল এর একটা কামরাতে গিয়ে উঠলো। নিলয় সাহেব সত্যি কান্তার সব শর্ত পুরণ করলো। কিন্তু অতিরিক্ত আর প্রেমিকসুলভ আচরন কান্তার মনে জোয়ার ভাটা তৈরি করলো প্রতিনিয়ত।
এসব কিছু কান্তার কাছে বেশি বেশি লাগলো। প্রাকৃতিক সমুদ্রের লীলা খেলা আর বৃষ্টিবিলাশ সে একাই উপভোগ করতে চাইছিল। কিন্তু অন্য একজন যেন জোর করে তার অংশীদার হলো। কান্তা অনেকভাবে বুঝানোর চেষ্টা করলো শর্তমতে সে কিছুক্ষন একা থাকতে চায়। এসব আচরনে সে বিরক্ত হচ্ছে কিন্তু তাতে কোন কাজ হলো না।
নিলয় সাহেব রোমান্টিক পুরুষের মতো বার বার কান্তার হাত ধরে সমুদ্র সৈকতে হাটতে চাইলো। কান্তার কল্পনার জগতে অনুমতিবিহিন প্রবেশ ঘটালো। রাতের খাবার গ্রহন করে রুমে ফিরলো তারা। কান্তার মন বিষন্ন হয়ে উঠল। কান্তার সব শর্ত রাখার আপ্রান চেষ্টা করেছে নিলয় সাহেব। কি করে বিশ্বাসঘাতকতা করবে কান্তা।
এতক্ষনে কান্তার বুঝতে বাকি নেই যে সে নিলয় সাহেবকে ভালবেসে ফেলেছে সে। মনে মনে কান্তা নিলয় সাহেবকে দোষারোপ করতে লাগলো। বাহিরে জ্যোৎস্না রাত। দখিনা বাতাস। কান্তা কিছু বুঝে উঠার আগেই। একটানে কান্তাকে কাছে টেনে নিলো। দুটো ঠোঁট মিলে গেলো। নিজের প্রতি কান্তার ঘৃনা হচ্ছে। কারন সে হেরে গেছে।
কান্তা ভালবাসাকে আশ্রয় দিয়ে ফেলেছিল। আর নিলয় সাহেবের জয় হয়েছে। কান্তা তার রুমের বেলকনিতে বসে এখনো চেস্টা করছে। সব নাম্বার অফ। ফেসবুক ব্লক। সেই নাম দিয়ে খুজলেও আর খুজে পাওয়া যায় না। কান্তার বাসার কাজের মেয়ে ডাকতে এসেছে। ড্রয়িং রুমে কান্তাকে পর্য্যবেক্ষন করার জন্য তার ডক্টর এসে সেই কখন থেকে বসে অপেক্ষা করছেন।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *